মাত্র কিছুদিন হল নতুন সেমিস্টার শুরু হয়েছে। এবারের সেমিস্টারটার রুটিন বেশ মনমতো হয়েছে। সপ্তাহে ৩দিন ছুটি! একেবারে ওয়াও একটা ব্যাপার। পুরো সেমিস্টার টই টই করে ট্যুর দেয়া যাবে।

গত কয়েক সেমিস্টার থেকে আমার ট্যুর রোগ শুরু হয়েছে। শুধু ট্যুর দিতে মন চায়। গত সেমিস্টারেও বেশ কয়েকটা ট্যুর দিয়েছি। আরেকটা সমস্যাও আছে। একা একা ট্যুরে যেতে ভাল লাগে না। সাথে পরিচিত কেউ থাকলে সাচ্ছন্দ্য বোধ হয়। কিছু দিন আগে আমার ক্লাসমেট আশিক আর শাকিল টাঙ্গুয়ার হাওড় গিয়েছিল বেড়াতে। ওরা ছবি তুলে এনেছে, অসাধারণ সুন্দর জায়গাটা। আমাকে জানায়নি। আমি ঠিক করলাম আমিও আগামী বৃহস্পতি-শুক্র একটা ট্যুর দিই কোথাও।

ঘোরাঘুরির ভাল সঙ্গি পাওয়া একটু কস্টকর। সুহৃদকে ফেইসবুকে নক করলাম। সুহৃদ আমার খুব পছন্দের একটা ছোটভাই। সম্প্রতি আমার ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। সেই সুবাদে সম্পর্কটা বেশ ভালই। অফার করলাম চল কোথাও ঘুরে আসি। সুহৃদ রাজি হয়ে গেল। এখন আলোচনা করছি কোথায় যাওয়া যায়। এরমধ্যে আবার বাজেট একটা ব্যাপার। এমন একটা ট্যুর দিব যেটা সাধ্যের মধেই ভাল করে ঘুরে আসা যায়।

দুজনে ঠিক করলাম হাম হাম যাব। হাম হাম সিলেটের শ্রীমঙ্গে অবস্থিত। প্রাকৃতিক জলপ্রপাত। এই ঝর্ণা দেখতে প্রায় ৭ কিলোমিটার পায়ে হাটতে হয়। আমরা খুব এক্সাইটেড। চাচ্ছিলাম ট্যুরটা অ্যাডভেঞ্চার জাতীয় হোক এজন্য। (কেউ হাম হাম যেতে চাইলে এই লেখাটি পড়তে পারেন)

আমি এযাবৎ যত ট্যুর করেছি তার সবটিতেই জাকির ভাই ছিল। জাকির সহজসরল ও আবেগপ্লাবিত ফিলোসফার একটা ভাই আমার। অনলাইন জগতে যত মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি সবচেয়ে আদর পেয়েছি জাকির ভাইয়ের কাছ থেকে। সুহৃদ আর জাকির দুজন খালাতো ভাই। সুহৃদকে বললাম জাকির ভাইকে ইনভাইট করি।

জাকির ভাই প্রথমে যাবে না বলল। অফিসে নাকি অনেক ঝামেলা। বললাম ছুটির দিনেও ঝামেলা? হ্যা। জাকির ভাই চাকরীতে জয়েন করার আগে এমন ছিল না। আগে যেকোন দিন ইচ্ছা হলেই বিভিন্ন জায়গা ঘুরত। একা একা। উনি একা একা ট্যুর করতে পছন্দ করে।

পরে কয়েকবার রিকুয়েস্ট করলাম ম্যানেজ করার জন্য। অবশেষে হ্যা! 😀 সবার সুবিধার ক্ষেত্রে আমরা ঠিক করলাম ১১-১২ তারিখ ট্যুর করি। ১১-১২ তারিখ পর্যায়ক্রমে পুজা ও পবিত্র আশুরা দিবস। সরকারী ছুটি।

জাকির ভাই ফেইসবুকের একটা ইভেন্ট লিংক দিল। “ধুপপানি ও মপ্পোছড়া ঝরনার রাজ্যে“। বিল্লাহ মামুন ভাইয়ের ইভেন্ট। বিল্লাহ মামুন ভাই আমাদের দুজনের আগেথেকেই পরিচিত। উনি ফেইসবুকে “WE Travelers BD” গ্রুপটি পরিচালনা করেন। ট্যুর করার উস্তাত উনি। সারাবছর শুধু ট্যুরের উপরেই থাকেন।

ভালই হল। ওই ইভেন্টের তারিখও ১১-১২ তারিখ। ধুপপানি ও মপ্পোছড়া দুইটা ঝর্ণা ঘুরাবে। ঝর্ণা রিলেটেড বেশীরভাগ ট্যুরেই খুব হাটতে হয়। এজন্য এগুলিকে ট্রেকিং ট্যুর বলে। এসব ট্যুরে গেলে অনেকক্ষণ হাটাহাটির মানসিকতা ও সামর্থ থাকতে হয়। ঝর্ণা দুটি রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত। ঢাকা থেকে কাপ্তাই নেমে এরপর নৌকা/ট্রলারে করে বিলাইছড়ি যেতে হয়। যোগাযোগ করার পর মামুন ভাই জানাল ক্যাপাসিটি অলরেডি ফুল হয়ে গেছে। সামনে পূজা এজন্য অনেক কষ্টে উনি ১৪ টি টিকিট ম্যানেজ করতে পেরেছেন। টিকিট এভেইলএবল না থাকায় আর কাউকে নিতে পারছেন না। তবে উনি অফার করল আমরা চাইলে টিকিট ম্যানেজ করে অন্য বাসে গিয়ে তাদের সাথে যোগ দিতে পারি।

অনেক খুজেও ঢাকা-টু কাপ্তাই বাসের টিকিট পাওয়া গেল না। আমরা ঠিক করলাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে গিয়ে ওদের সাথে যোগ দিব। পরে আমি সহজ.কম এ ঢাকা-চট্টগ্রামের টিকিট কাটলাম।

১০ তারিখ রাতের বাস। গাবতলী বাস কাউন্টারে আমি, সুহৃদ আর জাকির ভাই সময়মত পৌছুলাম। ১০:৩০ এ বাস ছাড়বে। নির্ধারিত সময়ের আধ ঘণ্টা পরে বাস ছাড়ল। হানিফ এন্টারপ্রাইজ। বাসের মধ্যে শুধুমাত্র ১জন কাউন্টারে টিকিট কাটা, বাকি সবাই সহজ.কম থেকে আগেই টিকিট কেটেছে। শুনে বেশ অবাকই হলাম। মানুষ এখন ডিজিটাল হচ্ছে। যাহোক সহজ.কম এ বাসের টিকিট কাটলেও এনালক সিস্টেম অনুযায়ী টিকিট প্রিন্ট করে নিয়ে আসতে হয়। আমি প্রিন্ট করতে ভুলে গিয়েছিলাম। বাসের মধ্যে এটা নিয়ে ঝামেলা হয়েছিল, পরে সায়দাবাদে নেমে ওদের কাউন্টার থেকেই টিকিট প্রিন্ট করে নিয়েছি। তাই সহজ থেকে টিকিট কাটলে অবশ্যই প্রিন্ট করে নিতে ভুলবেন না।

সকাল ৫.৩০ এ বাস পৌছানোর কথা ছিল জ্যাম থাকায় ৭.৩০ এ নামতে হয়েছে। চট্টগ্রামে নেমেই তাড়াহুড়ো করে রওয়া দিলাম কাপ্তাই এর উদ্দেশ্যে। ওখানে গিয়ে মামুন ভাইয়ের টিমের সাথে যোগ দিব। ৯.২০ এ ওখানে পৌছুলাম। উনাদের বাস লেট করেছে অনেক। ওরা ৬টার দিয়ে পৌছুনোর কথা ওখানে। কিন্তু পৌছেছে ৯টায়। ভালই হয়েছে। আমরা সময়মত যোগ দিতে পেরেছি।

 

চট্টগ্রামের রাস্তাগুলির দুইপাশে দূরে দূরে সুন্দর পাহাড়। সকালে না ঘুমিয়ে জানালা দিয়ে তাকালে মুগ্ধ হবেন। 

 

কাপ্তাই যাওয়ার পথে, সিএনজি থেকে

কাপ্তাই পৌছেই দেখি বিশাল একটা টিম হয়েছে। ঢাকা থেকে ১৪ জন আর কুমিল্লা থেকে আরো একটা টিম যোগ দিয়েছে আমাদের সাথে। আমরা ২১ জনের বিশাল একটা টিমে পরিণত হলাম।

 

কাপ্তাই ছোট একটা হোটেলে পালা করে সবাই মিলে সকালের নাস্তা পেট ভরে খাচ্ছি।

১০টার দিকে রওনা দিলাম বিলাইছড়ি এর উদ্দেশ্যে। বড়সড় একটা ট্রলার ভাড়া করা হয়েছে। বেশীজন একসাথে কোথাও গেলে অনেক সুবিধে আছে। সবকিছু ভাগাভাগি হওয়ায় খরচ অনেক কমে যায়।

আমাদের ট্রলার

ট্রলার ছাড়তেই চোখে পড়েছে সাজানো সারি সারি বাঁশ। সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছে।

 

এভাবে কেন সাজিয়ে রেখেছে জানিনা। সম্ভবত পরে বিক্রি করবে।

ওই দেখা যায় কাপ্তাই বাঁধ

পানির দুই ধারে অনেক পাহাড়। সুন্দর সুন্দর পাহাড়। ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে এরকম সুন্দর সুন্দর পাহাড় দেখেছি। চারিদিকের পরিবেশ দারুন মনমুগ্ধকর।

দূরের ওই পাহাড়গুলির কাছে যাচ্ছি

চারিদিকের পরিবেশ এত সুন্দর যে সবসময় ছবি তুলতে ইচ্ছে করছে। অনেক ছবি তুলেছি। ছবিতে আসলে আসল সৌন্দর্য বোঝা যায়না। ছবি তুলেছি শুধু সৃতি রাখার জন্য। ১০ বছর পর হয়ত ভুলে যাব কিন্তু ছবি থেকে যাবে।

হৃদের পানি টলটলে পরিস্কার। আবছা নীল দেখা যায়। আকাশে রোদ-মেঘ খেলা করছে তাই ছবির লাইট অদ্ভুত এসেছে

মুগ্ধকর পরিবেশ (ছবিতে ইচ্ছেকরেই কালার একটু বেশী দিয়েছি কারণ খালি চোখে এরকমই দেখা যায়)

এগুলা কি জানিনা। সম্ভবত মাঝ ধরার জন্য কোন কিছু

মাঝখানে আর্মি ক্যাম্প। পরিচয়পত্র দেখাতে হয়। সেফটির জন্য। যদি আমাদের কিছু হয়ে যায় তখন কাজে আসবে। তাই ঘুরতে গেলে অবশ্যই সাথে করে ছবিসহ যেকোন পরিচয়পত্র নিয়ে যেতে ভুলবেন না। নাহলে ঝামেলা করবে।

আর্মি ক্যাম্প। স্থলে ক্যার্ন্টনমেন্টগুলি যেরকম পরিছন্ন আর সুন্দর হয় এখানে পাহাড়ে হৃদের মাঝেও এরকই রকম। 

আরেকটি দল যাচ্ছে বিলাইছড়ি

কলার ট্রলার। ফরমালিনমুক্ত 😉 ওইদিকে পাহাড়ে অনেক কলা চাষ করা হয়।

সুহৃদ

ট্রলারে বসে তাকিয়ে থাকলে প্রতিটি মুহুর্ত মুগ্ধতার ছোয়া পাবেন

ছোটবেলায় ক্যালেন্ডারে দেখা ছবিগুলির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে

২:৩০ ঘণ্টার পানিপথে জার্নি শেষে পৌছুলাম বিলাইছড়িতে।

বিলাইছড়ি

ট্রলার থেকে নামছি সবাই

নেমেই স্থানীয় একটা দোকানে চা খেলাম। এরপরই হোটেলে ঢুকলাম। যদিও সবার জন্য আগেথেকেই হোটেল বুক করা ছিল। তবে ছুটিতে লোকজন অনেক বেশী হওয়ায় সবার জন্য পর্যাপ্ত পরিমান রুম বুক করতে পারেনি। আমরা উঠেছি হোটেল মালিকের পারসোনাল রুমে। পিচ্চি পিচ্চি রুম। আমাদের একরুমে ৫জন থাকতে হবে 🙁

এগুলার এক ধরণের খাবার। শুটকির মত উটকো গন্ধ। নাম নাপ্পি সিদল। শুনেছি পচা মাছ এভাবে ভর্তা করে এটা বানানো হয়। স্থানীয়দের খুব প্রিয় খাবার।

স্থানীয় বাজার, পাহাড়ী আদিবাসী অঞ্চলগুলি মহিলা প্রধান তাই মহিলারাই বেশীরভাগ কাজ করে।

আমরা রুমে ব্যাগ রেখে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ হয়ে বেরিয়ে পড়লাম মুপ্পোছড়া ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। ঘড়িতে ১টা বেজে গেছে। আবার ট্রলারে উঠলাম সবাই।

আমাদের মাঝি। মাঝির নাম অনেক কঠিন। “সইলাব্রু”

ন্য এক ভাইয়ের থেকে ধার করা সেলফি স্টিক দিয়ে এই প্রথম ছবি তুলেছি। আমি DSLR নিয়ে যাইনি। সবছবি আমার মোবাইল দিয়েই তোলা।

কিছুদূর গিয়েই একটা জায়গায় নামিয়ে দিল। ওখান থেকে এক থেকে দেড় ঘণ্টা হাটতে হবে। শুরু হল হাটাহাটি। প্রথমেই পার হতে হবে হাটুপানি।

এখান থেকে হাটতে হবে

ট্রেকিং ট্যুরে যেতেহু অনেক হাটতে হয় সেহেতু ভাল গ্রিপযুক্ত জুতা নেয়া উচিত। এতে হাটতে সুবিধে হয়। আর কাদা-পানি অনেক থাকে তাই থ্রিকোয়ার্টার পরলে ভাল হয়।

হাটছি সবাই

জঙ্গলি ফুল। নাম জানিনা। ভাল লেগেছে তাই তুলেছি 😀

পুরো পথ এরকম পাথুরে। পাথরগুলি পিচ্ছিল। বেখেয়াল হলেই পা মচকে যেতে পারে।

ভয়ংকর সুন্দর পথ

এটা সেমি ঝর্ণা। এটারও নাম আছে। মনে পড়ছে না। তবে যাওয়ার পথে এরকম ছোট ছোট অনেক ঝর্ণা আছে। আসল ঝর্ণা অনেকক্ষণ পরে পাবেন।

 

অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। মুপ্পোছড়া ঝর্ণায় যেতে চায়না। তাই এখানেই গোসল করে ফিরে যায়

আমরা থামার পাত্র নই। এই ঝর্ণার পার হয়ে চলতেই থাকলাম।

সরাসরি ঝর্ণা দিয়ে উপরে ওঠা সম্ভব নয় তাই সাইড দিয়ে অন্য একটি পাহাড়ে উঠে তারপর পার হতে হবে

এরকম জঙ্গলের রাস্তায় অনেক পোকামাকড় থাকে। সাবধানে দেখেশুনে হাটা উচিত।

আমাদের গাইড। গাইড অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কখনো গেলে অবশ্যই সঙ্গে করে নিতে ভুলবেন না।

আসল ঝর্ণায় পৌছে গেছি। এতক্ষণের হাটার ক্লান্তি চলে গেছে। গোসল করব। জাকির ভাই আমাদের আগেই অন্য একটা গ্রুপের সাথে পৌছে গেছে।

মুপ্পোছড়া ঝর্ণা। পানি একটু কম তবে। যা আছে যথেষ্ট!

আমি মোবাইল বের করে তাড়াতাড়ি একটা ৩৬০ ডিগ্রি একটা ছবি তুললাম। ৩৬০ ছবিটি গুগল ম্যাপে যোগ করে দিয়েছি। ঝর্ণার পুরো ভিউটা দেখতে চাইলে এখানে ক্লিক করতে দেখতে পারেন।

জাকির ভাই নাকি গোসল করবে না। লস প্রজেক্ট 😛 উনাকে মোবাইল জমা দিয়ে আমি আর সুহৃদ ভেজার জন্য ঝর্ণার কাছে গেলাম।

মুপ্পোছড়ায় জাকির ভাই

আমাদের উরাধুরা গোসল চলছে। মুপ্পোছড়ার সবগুলি ছবি জাকির ভাইয়ের GoPro ক্যামেরা দিয়ে তোলা। ওয়াটারপ্রুফ কেস পরিয়ে ছবি তুলেছি সবাই।

আমার সেকি আনন্দ! 😛 নিজের ছবি দেখে নিজেই আবেগপ্লুত হয়ে গেলুম

জাকির ভাই আমাদের গোসল দেখে লোভ সামলাতে পারেনি। উনিও গোসল করতে আসছে।

আমার ক্যাপ্টেইন আমেরিকা ভাই 😀

ঝর্ণা থেকে অনেক উপরে উঠেছি। খুবই সাবধানে উঠতে হয়। পা পিছলেই আলুর দম। 

গোসল শেষে ফিরে যাচ্ছি আমাদের হোটেলে। হোটেলে পৌছুতে ৫টা বেজে গেছে। ওখানে গিয়ে ফ্রেস হয়ে ৬টার দিকে দুপুরের খাবার খাওয়া হল। ডাল, আলুভর্তা আর অপশনাল আইটেম। আমি ছোট ছোট চাপিলা মাছের ফ্রাই নিয়েছি। দারুন টেস্ট।

সবাই ক্লান্ত হয়ে গেছি। রুমে এসে যে যার গ্যাজেট চার্জ দিচ্ছি। খেয়ে দেয়ে কেউ ঘুম কেউ কার্ড খেলছে। সুহৃদ কার্ড খেলার দলে। আমি আর জাকির ভাই ঘুমাব। বেশীক্ষণ ঘুমাতে পারিনি। ১১টার দিকে ডাকল রাতের খাবারের জন্য। সন্ধার খাওয়া ঠিকমত হজম হয়নি। আবার হালকা একটু করে খেলাম। এরপর হালকা মুতে ঘুমাতে যাবার প্রিপারেশন নিচ্ছি। ১ টা বেজে গেছে। চোখ বন্ধ করে ৫মিনিট পরেই দেখি ভোর ৪:৩০ বেজে গেছে। বাইরে থেকে ডাকছে রেডি হওয়ার জন্য। ধুপপানি ঝর্ণা যাব। যেতে অনেক সময় লাগবে।

আগে গেলে ভাল। ঝর্ণা ফাকা থাকবে। এত সকালে নাস্তা নেই। তাই খালি পেটেই রওনা দিলাম সবাই। আজকে সকাল থেকেই ঝিমঝিম বৃষ্টি! অবহাওয়া ঠান্ডা আর আকাশটাও বেশ মেঘলা।

সামনে মেঘালয় দেখা যাচ্ছে। বৃষ্টি হওয়াতে অনেক মেঘ জমেছে। 

২ঘণ্টা পর পৌছুলাম একটা ঘাটে। এখান থেকে ছোট নৌকা করে আরেকটা ঘাটে যেতে হবে। এরপর একটানা পুরো ২ ঘণ্টা হাটতে হবে।

পাশে আমাদের ট্রলার। আমরা ট্রলার থেকে ছোট নৌকায় উঠছি।

বৃষ্টি পড়তেই আছে। মাথায় সবাই প্লাস্টিক দিয়েছি। অনেক ঠান্ডাও লাগছে।

হাটার পালা

নৌকা নেমে সবাই হাটব এখন। মামুন ভাই সাথে করে এক প্যাকেট লবণ নিয়েছে। রাস্তায় অনেক জোক।

বৃষ্টি হওয়াতে রাস্তাগুলিতে কাদা হয়েছে আর অনেক পিচ্ছিল। পুরো রাস্তা খিয়ারা মাটি। পিছলে যাবার জম। 

পাহাড়ে উঠছি

আমাদেরকে ৩টা বড় বড় পাহাড় পার হতে হবে। পাহাড়ে ওঠা খুবই শক্তিসামর্থ্য, তারউপর বৃষ্টি আর কাদা আমাদের ট্রেকিংকে আরো অনেক কঠিন করে ফেলেছে।

দ্বিতীয় পাহাড়ে ওঠার আগে একটু রেস্ট নিচ্ছি। রাস্তা অনেক পিচ্ছিল আর পাহাড়ে ওঠার সুবিধার্থে অনেকজন বাসের লাঠি নিয়েছে। গাইডকে বললেই গাইড বাশ কেটে লাঠি বানিয়ে দেয়।

দ্বিতীয় পাহাড়ের উপরে উঠেছি। সামনেরটা মামুন ভাই। আমাদের ইভেন্ট হোস্ট। 

আমি আর সুহৃদ। মুখে হাসি ধরছে না। 😀

সেলফি ব্রেক 😉

কি রোমাঞ্চকর সিড়িঁ! -_- সাপ-লুড়ু খেলার সিড়ির কথা মনে পড়ে গেছে।

ব্যাংকার সাহেব পড়ে গিয়েছিল 😀

আমাদের মধ্যে থেকে ৭০% লোকজনই অন্তত একবার বিভিন্ন জায়গায় পিছলে পড়ে গেছে। আমি না পড়াদের দলে ছিলাম। কিন্তু ফেরার পথে আমিও একবার পড়েছি 🙁

ছবি তুলতে না তুলতেই ভাই আবারও পা পিছলে আলুর দম!

তবে একবার পিছলে পড়লে পরেরবার আর ভয় থাকে না। সুবিধে আছে। শরীর গরম হয়ে যায় 😛

খাড়া ঢালু রাস্তা। প্রচুর পিচ্ছিল। নামার দিকে থেকে এই জায়গাটা ছিল সবচেয়ে কষ্টকর। পুরো জার্নির বস লেভেল বলা যায়।

ঝর্ণার কাছে চলে এসেছি। নিচে নেমে একটু পরেই ঝর্ণা 😀

অবশেষে! ধুপপানি ঝর্ণা ^_^

ধুপপানি ঝর্ণা অনেক সুন্দর। ঝর্ণাতে এখন পানিও অনেক। মুপ্পোছড়া ঝর্ণা সুন্দর কিন্তু ধুপপানির সাথে ওটার কোন তুলনা হবে না।

ধুপপানি ঝর্ণার কাছে এক গুহায় স্থানীয় বাবা ধ্যান করেন। তার ধ্যান ভাঙ্গলে স্থানীয়দের ক্ষতি হবে। তাই ঝর্ণায় বেশী চিল্লাপাল্লা করা যাবে না।

ঝর্ণার চারিদিকটা গোল করে ঘেরা। পুরোটাই পাথর। মনে হচ্ছে পাথরের মধ্যে কেউ বিশাল গর্ত করে পানি ঢালছে।

তখনো বৃষ্টি আগেরমতই হচ্ছিল। কিন্তু আমি ৩৬০ ডিগি ছবি তোলার লোভ সামলাতে পারলাম না। আমার মোবাইল ওয়াটারপ্রুফ না। তারপরও রিস্ক নিয়ে বের করলাম 🙂 ধুপপানি ঝর্ণার ৩৬০ ডিগ্রি ছবিটি গুগল ম্যাপে দেখতে এখানে ক্লিক করতে পারেন। 

চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মত দৃশ্য

ঝর্ণার গুহার ভেতরে থেকে সেলফি 😀

অপরূপ সুন্দর

ধুপপানি ঝর্ণা দেখা শেষ। এবার আবার ২ঘণ্টা হেটে আমাদের নৌকায় ফিরে যেতে হবে। বৃষ্টি তখনো থামেনি। বিদায় ধুপপানি।

দীর্ঘ জার্নি শেষে ট্রলারে ফিরেই হৃদের পানিতে গোসল করেছি সবাই।

গোসল করে এখন হেবি ফ্রেস লাগছে। এখন বাজে দুপুর ২টা। সকালে খাওয়া হয়নি কিছুই তাই পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা সবার। দুঃখের সংবাদ হল আমাদের আরো ৪ঘণ্টা ট্রলারে জার্নি করে কাপ্তাই ফিরে যেতে হবে। মানে ৬টার দিকে পেট পূজো দিতে পারব সবাই। 🙁

পাহাড়ে মেঘ জমে আছে

ফেরার পথে পরিবেশটা ছিল খুবই মুগ্ধকর। আর্মি ক্যাম্পে আবার এসেছি। তখন বৃষ্টি থেমে গেছে।

বিদায় বিলাইছড়ি, কাপ্তাই, রাঙ্গামাটি 🙁

ট্রলার থেকে নামছি

পেট পূজো দিব সবাই 😀

খাওয়া শেষে বের হয়ে দেখি চমৎকার দেখা যাচ্ছে আকাশটা

২১ জনের দল থেকে ভাগ হয়ে আমরা ৯ জন ঢাকায় ফিরছি। বাকিরা কুমিল্লা যাবে।

 

টানা দুইদিন ধরে পুরো লেখাটি লিখেছি। আমি জানি বিশাল বড় হয়ে গেছে। তবুও অনেককিছু লিখতে পারিনি এবং অনেক অনেক ছবিও দেইনি।