উইকিপিডিয়ার সহপ্রতিষ্ঠাতা জিমি ওয়ালেস

‘জনগণের একটি বড় দল, কয়েকজন সম্ভ্রান্তের চেয়ে সহজাত গুণেই চৌকস।’
—জেমস সুরেউইচকি, দি উইজডম অব ক্রাউড
‘প্রিয় মহাশয়, আপনার তৈরি করা ওয়েবসাইটে মারাত্মক নিরাপত্তা-ত্রুটি আছে। একটু আগে আমি আপনার সাইটের একটি নিবন্ধে নিজেই কিছু তথ্য যোগ করেছি। আশা করি, আপনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
‘ধন্যবাদ। তবে, আপনি যেটিকে ত্রুটি মনে করছেন, সেটি আসলে ত্রুটি নয়, এটি এই সাইটের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। আপনার মতো যাঁরা এই সাইটে তথ্য যোগ করতে চান, তাঁরা সবাই সেটি করার জন্য আমন্ত্রিত।’
বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার (www.wikipedia.org) সহ-উদ্যোক্তা জিমি ওয়ালেস প্রতিদিনই অজস্র ই-মেইল পান। এর মধ্যে একটি বড় অংশ মনে করেন, তিনি একাই উইকিপিডিয়া লিখেছেন! কাজেই তিনি মহাজ্ঞানী এবং সব বিষয় জানেন। ফলে চিকিৎসা পরামর্শ থেকে শুরু করে দাদার সম্পত্তিতে পাওয়া পারদ দিয়ে কী করা যায়, তার বয়ানও থাকে। তবে শুরু করার ১০ বছর পরও যখন তিনি এই নিবন্ধের শুরুতে লেখা ই-মেইল পান, তখন আর হাসি চেপে রাখতে পারেন না! কখনো কখনো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন।
উইকিপিডিয়া একটি মুক্ত বিশ্বকোষ। এর মানে হলো, যে কেউ ইচ্ছে করলেই এই বিশ্বকোষে তথ্য যোগ করতে পারে।একটি কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট সংযোগ আর সদিচ্ছা। ব্যাস, আপনিও হয়ে যেতে পারেন একজন বিশ্বকোষ সম্পাদক!
কত্তো বড়
আজ থেকে ১০ বছর আগে নিলাম ডাককারী জিমি ওয়ালেস এই কর্মযজ্ঞ শুরু করেন। কোনো বেতনভোগী বিশেষজ্ঞ, সম্পাদক বা লেখক দিয়ে এই বিশ্বকোষ লেখানো হয় না, বরং এই বিশ্বকোষের লেখক হয়েছেন তাঁরা, যাঁরা তা হতে চান! উইকি নামের একটি সফটওয়্যার, যা দিয়ে ওয়েবসাইটে সম্পাদনা, মোছা কিংবা পরিবর্ধন করা যায়, সেটি ব্যবহার করে ওয়ালেস আর তাঁর স্বেচ্ছাসেবী কর্মীরা গড়ে তুলেছেন এক বিশাল জ্ঞানভান্ডার, যার সঙ্গে তুলনা চলে কেবল আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের।
শুরুতে অর্থাৎ ২০০১ সালে অনেকে একে পাগলামি বলেছেন। আর এখন এটি এই গ্রহের সবচেয়ে বড় বিশ্বকোষ, প্রতি মুহূর্তে তা বিকশিত হচ্ছে। বিশ্বের মোট ২৭৬টি ভাষার সব কটি মিলে এর ভুক্তি এবং নিবন্ধের সংখ্যা ১৭ কোটির বেশি। এর মধ্যে ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি ভাষার উইকিপিডিয়ায় ১০ লাখের বেশি নিবন্ধ আছে! আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় মোট নিবন্ধ আছে ৩৪ লাখ! এই ২৭৬টি ভাষার মধ্যে আমাদের বাংলা ভাষাও আছে (http://bn.wikipedia.org)। এ প্রতিবেদন লেখার দিন (১০ জানুয়ারি) বাংলা উইকিপিডিয়ায় ২২ হাজার ৬৮টি নিবন্ধ ছিল। আর এই বিশাল সম্পাদনা করেন উইকিপিডিয়ানরা। উইকিপিডিয়ার লেখক-সম্পাদকেরা নিজেদের উইকিপিডিয়ান হিসেবে পরিচয় দেন। কমপক্ষে ১০টি সম্পাদনা করেছেন—এমন সম্পাদকের সংখ্যা ১২ লাখ ১৬ হাজার ৭৩৯ জন। যেহেতু সবাই মিলে এটি সম্পাদনা করেন, কাজেই প্রতিটি নিবন্ধেই অনেকের ছোঁয়া থাকে। প্রতিটি ভুক্তি গড়ে ৩৭ বার সম্পাদিত হয়। অনেকের ধারণা, যে কেউ লেখেন বলে এটির ভুক্তিগুলো কোনো কাজের নয়! তা ছাড়া অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবেই এখানে ভুল ও বিকৃত তথ্য যোগ করতে পারেন। কিন্তু যেমন আশা করা হয়েছিল, ঠিক সেভাবে এর ব্যবহারকারীরাই এটিকে রক্ষা করে চলেছেন। অনেক সম্পাদক বিশেষ বিশেষ নিবন্ধকে ‘নজরে’ রাখতে পারেন। সে ক্ষেত্রে সে নিবন্ধটিতে কোনো পরিবর্তন হলে তিনি সেটা জানতে পারেন। এভাবে যাঁরা খুব চেষ্টা করেন, তাঁরাও তাঁদের ভুল তথ্য শেষ পর্যন্ত টেকাতে পারেন না। বিশ্বখ্যাত ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে ১.৭ মিনিটের মধ্যে উইকিপিডিয়ায় যোগ করা আপত্তিকর তথ্য মুছে যায়। এ ক্ষেত্রে একটি ভালো উদাহরণ রয়েছে বাংলাদেশের উইকিপিডিয়ানদের। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার বাংলাদেশ ভুক্তিটিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামকে নেহাত গৃহযুদ্ধ বা গন্ডগোল হিসেবে চিহ্নিত করা, যুদ্ধের বিভিন্ন পরিসংখ্যান ইত্যাদি পাল্টে দেওয়ার জন্য একদল পাকিস্তানি খুবই চেষ্টা করেছে। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশের উইকিপিডিয়ানদের তীক্ষ দৃষ্টি এড়িয়ে তাদের পক্ষে সে প্রোপাগান্ডা চালানো সম্ভব হয়নি।
বিশ্বকোষ তখন আর এখন
জ্ঞানের আকর হিসেবে সব জানা জ্ঞানকে একত্র করার ঘটনা অবশ্য এটিই প্রথম নয়। শুরুতে বিশ্বকোষ ছিল একজন চৌকস মানুষের অবদান। প্রাচীন গ্রিসে অ্যারিস্টটল প্যাপিরাসের ওপর কলম দিয়ে নিজেই লিখে ফেললেন যত জ্ঞানের কথা। এর ৪০০ বছর পর রোমের প্লিনতি ৩৭ খণ্ডের বিশ্বকোষ সৃষ্টি করলেন একাই। নবম দশকে চীনা গবেষক তু উ একটি বিশ্বকোষ লেখেন। ১৭০০ সালে দিঁদেরো এবং তাঁর কয়েকজন বন্ধু (ভলতেয়ার আর রুশোও ছিলেন) ২৯ বছরে সৃষ্টি করেন Encyclopédie, ou Dictionnaire Raisonné des Sciences, des Arts et des Métiers। শিল্প বিপ্লবের পর এ ধারার কিছুটা ব্যতিক্রম ঘটিয়ে নতুন একটি পদ্ধতি শুরু হয়। নতুন পদ্ধতিতে এক জায়গায় জড়ো করা হয় একদল বিদগ্ধ ব্যক্তিকে। স্কটল্যান্ডের এনসাইক্লোপিডিয়া অব ব্রিটানিকা হলো এ ধারার সফল উদাহরণ।
উন্মুক্ত বিশ্বকোষ
একজন প্রকৃত চৌকস মানুষের পরিবর্তে উইকিপিডিয়া কয়েক হাজার মোটামুটি মানের চৌকস মানুষকে জড়ো করেছে একই কাজের জন্য। সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলি বা চেইন অব কমান্ডের পরিবর্তে উইকিপিডিয়া গ্রহণ করেছে ‘উন্মুক্ত সোর্সকোড’ দর্শনকে। একবার মুদ্রিত হওয়ার পর বিশ্বকোষ মাত্রই ফসিলে পরিণত হতে শুরু করে। কিন্তু উইকি সফটওয়্যারের মাধ্যমে সাধারণ সম্পাদনা, পরিবর্ধন, বর্জনের কারণে উইকিপিডিয়া সতত চলমান, সদা পরিবর্তনশীল এবং বিনা মূল্যের বিশ্বকোষ। আপনার জানা যেকোনো বিষয়ের ওপর তথ্য খুঁজে দেখুন, নিঃসন্দেহে তা পেয়ে যাবেন।
হাওয়াই দ্বীপে বিমানবন্দর থেকে উইকি উইকি নামের বাস সার্ভিস রয়েছে। হাওয়াইয়ান ভাষায় উইকি মানে হলো, দ্রুত (কুইক)।. আর এই উইকি উইকি থেকে উইকিপিডিয়া নামটি নেওয়া হয়েছে। পুরো ব্যবস্থাটির পরিচালনা করে উইকিমিডিয়া ফাউন্ডেশন নামের একটি অলাভজনক সংস্থা।
বাংলা উইকিপিডিয়া
উইকিপিডিয়ায় বাংলাদেশ
বিগত বছরগুলোয় বাংলা উইকিপিডিয়ার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশের তথ্য সমৃদ্ধ হয়েছে। তবে, বাংলা উইকিপিডিয়া এখনো ততটা মাত্রায় বিকশিত হয়নি। এর একটি কারণ হলো, সাধারণ মানুষের কাছে এখনো ইন্টারনেট সেভাবে পৌঁছেনি, আর লেখার ব্যাপারটি এখনো সবাই করেন না। তবে এর সমাধানের নানা পথ রয়েছে। সহজ হলো, দেশে ওপেন সোর্স এবং স্বেচ্ছাশ্রমের দর্শনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। যাঁর একটি ডিজিটাল ক্যামেরা রয়েছে, তিনি দেশের নানা পুরাকীর্তি, ব্যক্তিত্ব কিংবা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক কিছু ছবি তুলে তার স্বত্ব ত্যাগ করে ইন্টারনেটে উইকিমিডিয়া কমন্সে জমা দিতে পারেন। যাঁর একটি ইন্টারনেট সংযোগসহ কম্পিউটার বা মোবাইল ফোন আছে, তিনি চাইলেই একটি ভুক্তিকে সম্পূর্ণ করতে পারেন। আর নতুন ভুক্তি তৈরি করার কাজটিও বেশ সহজ। যেমন—প্রত্যেকেই তাঁর নিজের স্কুল বা কলেজের নামের ভুক্তিটি অথবা যে এলাকায় বসবাস করছেন, সেখানকার উল্লেখযোগ্য বা দর্শনীয় স্থানের তথ্য যুক্ত করে দিতে পারেন উইকিপিডিয়ায়। আর সম্পূর্ণটুকুই যে একজনকে লিখতে হবে এমন নয়, কাজ শুরু করার পর অন্যান্য অনেকেই সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসেন। যেমনটি আমাদের তারিফ এজাজ ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরেছেন। ভাইয়ের মোবাইল ফোন থেকে তারিফ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জানিয়েছেন বিশ্বের মানুষকে!
এভাবে বাংলাদেশের সব লোকের জন্য সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায়, বিনা মূল্যের বিশ্বকোষ তৈরির কর্মযজ্ঞে আপনিও শরিক হতে পারেন। আপনার তেমন কিছুই লাগবে না—কেবল সদিচ্ছা, আন্তরিকতা এবং এ বিশ্বাস যে, বিনিময় জ্ঞানের শক্তি।
আগামীকাল ১৫ জানুয়ারি উইকিপিডিয়ার দশম জন্মবার্ষিকীতে বাংলা উইকিপিডিয়ায় একটি লাইন যোগ করে আপনিও শামিল হয়ে যান মুক্ত জ্ঞানের বিকাশে। সুর করে গাইতেও পারেন—

বদ্ধ জ্ঞানের মুক্ত দরজা, উইকিপিডিয়া তুমি, মুক্ত জ্ঞানের প্রতীক
শুভ হোক তোমার জন্মদিন!

উইকিপিডিয়া

***************************************************************************************************

বিদ্রঃ লেখাটি প্রথম আলো থেকে নেওয়া।

***************************************************************************************************

আমার সবগুলো টিউন দেখতে উপরে ” আমার টিউনার পাতা” তে ক্লিক করুন।

ফেসবুকে আমি ঃ www.facebook.com/crazzzzzzyboy

***************************************************************************************************